কুলাউড়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রস্তুত করা সরকারি সহায়তার তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রবাসী পরিবারের সদস্য এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন অনেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বঞ্চিত কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কিছু নেতার সুপারিশে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি তালিকা প্রণয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে।
সরকারের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা প্রদানের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তালিকা তৈরির শুরু থেকেই মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেক প্রকৃত কৃষকের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৩ জুন বরমচাল ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে কৃষকদের মধ্যে চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। এ সময় ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া ও ইউপি সদস্য ছয়ফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন বঞ্চিত কৃষকরা। অভিযোগ অনুযায়ী, দাউদপুর গ্রামের মতিন মিয়া, যার দুই ছেলে ফ্রান্সে এবং এক ছেলে সরকারি চাকরিতে কর্মরত, তিনি সহায়তা পেয়েছেন। একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী জলিল মিয়া ও তার ভাই খালিক মিয়া, সাতরা গ্রামের নাদির মিয়া, ইউসুফ তৈয়বুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ আহমদ এবং জামাল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও তারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নন।
বরমচাল ইউনিয়নেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের খালেদ নামে এক ব্যক্তি বোরো ধানের জমি না থাকা সত্ত্বেও সহায়তা পেয়েছেন। এছাড়া ইমাম তরিকুল ইসলাম আকুল, সাবেক ইউপি সদস্য মহরম আলী এবং শাহিন আহমদ নাছির ও তার ভাই সেলিম আহমদও সহায়তা পেয়েছেন, যদিও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিদেশে অবস্থান করছেন।
ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছয়ফুল আলম বলেন, “প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অনেক প্রবাসী ও বিত্তশালী পরিবারের সদস্যদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া বলেন, চেয়ারম্যান, ইউনিয়নের কৃষি কর্মকর্তা এবং যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে ৫১৮ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ১৯০ জনের জন্য। তাড়াহুড়োর মধ্যে তালিকা প্রস্তুতের কারণে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে বলেও তিনি স্বীকার করেন। অন্যদিকে ইউপি সদস্য ছয়ফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুলাউড়ার বন্যাকবলিত কৃষকদের জন্য পরিবারপ্রতি ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা নগদ সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১ হাজার ৫৩৭ জন কৃষকের জন্য ৪৬ দশমিক ১ মেট্রিক টন চাল এবং ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ইউনিয়নে বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, চলতি বছরের বন্যায় অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে বরাদ্দ সীমিত হওয়ায় কিছু প্রকৃত কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তালিকা অনুমোদন ও সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ নজরে এসেছে এবং বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। কেউ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে মৌলভীবাজার-2 আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তা বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। তিনি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।