ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে। এমন অবস্থায় দিল্লি থেকে তার প্রকাশ্য বক্তব্যে অংশ নেওয়া নিয়ে ঢাকা কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
দেশে ফেরার ঘোষণা কেন?
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান তিনটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেছেন—
- বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজের জন্য আগের তুলনায় কিছুটা অনুকূল মনে করা।
- নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে চ্যালেঞ্জ করে রাজনৈতিকভাবে নিজেকে পুনর্বাসনের চেষ্টা।
- অথবা রাজনীতি থেকে সরে দেশে ফিরে জীবনের শেষ সময় নিজ দেশে কাটানোর ব্যক্তিগত ইচ্ছা।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান এবং দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, এই ঘোষণা মূলত শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার ভাষ্য, দলের গ্রহণযোগ্য নেতাদের সামনে আনার পরিবর্তে তিনি সবকিছু নিজের নেতৃত্বকেন্দ্রিক রেখেছেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদারের মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের ওপরও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন।
দেশে ফিরলে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের ধারণা, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তবে তার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘটনাই সমর্থক ও বিরোধী—উভয় পক্ষকে সক্রিয় করে তুলতে পারে, যার ফলে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে তার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও সরকারের ওপর দেশি-বিদেশি চাপ তৈরি হতে পারে।
অধ্যাপক জালাল উদ্দিন সিকদারও মনে করেন, শেখ হাসিনা কারাগারে গেলেও তার দেশে ফেরা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে সরকারের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের কড়া প্রতিক্রিয়া
সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ভারতের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অনুভূতির প্রতি অসম্মান।
ঢাকার দাবি, এ ধরনের কার্যক্রম দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চলমান প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে ব্যক্ত হওয়া মতামত সরকার সমর্থন করে না।
ভারত কি অনুষ্ঠানটি ঠেকাতে পারত?
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত চাইলে সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন হতে না-ও দিতে পারত। ফলে বাংলাদেশ এই ঘটনাকে শেখ হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির পরোক্ষ সমর্থন হিসেবেই দেখতে পারে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত অবশ্য মনে করেন, এই ঘটনা সাময়িক অস্বস্তি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। পারস্পরিক স্বার্থের কারণে দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে?
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার বিষয়টি এখনো ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম বড় সংবেদনশীল ইস্যু।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। ভারত বাংলাদেশে জ্বালানি সহায়তা দিয়েছে, নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ করেছে এবং ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুও আগামী দিনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্ককে সাময়িকভাবে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেললেও পারস্পরিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে ঢাকা ও নয়াদিল্লি শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার পথই খুঁজবে।